Sun. Mar 3rd, 2024

     মাজনার পাথুরে গুহায় ডারউইনের বিবর্তনবাদ

     কোনও দিনও ভাবিনি এই নয়াগ্রামের মাটি থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় এক্কেবারে সেই তাম্রপ্রস্তর যুগে। না কোনও টাইম মেশিনের দরকার নেই। ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রামের নিচু পাতিনার মাজনার বন্ধুর পাথরময় এলাকায় এলেই অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যায় ক্যাথোলিক যুগে। অন্ততঃ ৬ হাজার বছর আগে। ঝোপঝাড় ভেদ করে অন্ততঃ ৩০০ ফিট চড়াইয়ের পর আবার ৩০০ ফিট উতরাই। তারপরই সেই জায়গাটা। চারদিকটা পাথুরে টিলায় ঘেরা আদ্র এলাকা। এখানেই মিলবে “রক শেল্টার অফ পাতিনা।”

    Darwins-evolution-in-the-rocky-cave-of-Majna
    WhatsApp Group Join Now
    Telegram Group Join Now

    গুহা সম্পর্কে জানার ইচ্ছা তাই আমার বরাবরই বেশ ছিল। তবে ছেলেবেলা থেকেই কি এক বিচিত্র কারনে মনের মধ্যে গেঁথে ছিল গুহা মানেই পাহাড়ের গায়ে ছোট কিছু গর্ত যেখানে আশ্রয় নিয়ে কিছু মানুষ বসে থাকতে পারে। গুহাসমূহের ব্যাপ্তি বা বিশালতা সম্পর্কে পড়াশোনা থাকলেও মস্তিষ্ক থেকে ওই চিত্র সরাতে পারিনি। চর্মচোক্ষে কিছু না দেখলে যা হয় আর কি!
    বারবার মনে হচ্ছিল, গুহার দেয়ালের অন্ধকার কোটরে বসে অজস্র গুহামানব জ্বলজ্বলে চোখে আমাদের তাকিয়ে দেখছে। তারা ফিসফিস করে কথা বলছ। ‘ওহে মানুষ। সভ্য মানুষ। তোমাদের কাছে আমরা অসভ্য!  এই গুহা ছিল আমাদের বাড়ি, ঘর, সমাজ, রাষ্ট্র। আমরা দলবদ্ধ হয়ে ঘোরাফেরা করতাম, বাইরে বের হতাম জীবিকার জন্য। দলবেঁধে শিকার করতাম। একসঙ্গে খেতাম। নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতাম। এই ঘর বা সমাজ বা রাষ্ট্রে আমরা সবাই সমান ছিলাম। 
    আমাদের পরের প্রজন্মগুলো নাকি ধীরে ধীরে সভ্য হলো, গুহা থেকে বেরিয়ে জগতে ছড়িয়ে পড়লো। তারা বিশাল পৃথিবী নিজের করে নিলো। রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হলো। মানুষের মধ্যে উঁচুনিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি হলো,  সমাজে ধনী-গরিব তৈরি হলো। শোষক-শোষিত বিভাজন হলো। পরস্পরের প্রতি অন্যায় অবিচার, খুন বাড়তে থাকল। আমরা ভাবি, সভ্য কারা! তোমরা আধুনিক মানুষেরা, নাকি আমরা গুহামানবেরা! ’ডারউইনের বিবর্তনবাদ বলে এরাই আমাদের পূর্বপুরুষ। বিজ্ঞান আর দর্শনের বিরল মেলবন্ধন যেন এই মাজনার নিস্তব্ধ মায়াবী আবহাওয়ায়।

    Darwins-evolution-in-the-rocky-cave-of-Majna

    সেই যুগেও সুবর্ণরেখা ছুটে আসত ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে। তার গতিপথ জুড়ে ইউরেনিয়াম, সোনা ও তামা প্রভৃতি ভারী ধাতুর আকরিক ছিল বা এখনও আছে। সুতরাং এটা স্বাভাবিক যে, লোহার ব্যবহার শেখার আগেই তাম্র-প্রস্তর যুগে মানুষ তামার খোঁজে এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। প্রায় ২০ বছর আগে সুবর্ণরেখার বন্যায় ধস নামায় নয়াগ্রাম-গোপীবল্লভপুর সীমান্তে পাতিনা গ্রামে তাম্রযুগের চুল্লি এবং গুহাবাসী মানুষের আস্তানার প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়। 
     অধ্যাপক অমল‌েন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “রক শেল্টারস অফ পাতিনা” বইটি বিস্তারিত লিখেছেন সেই আবিস্কারের কথা। নিচু পাতিনার বাসিন্দা পেশায় হাতুড়ে চিকিৎসক দীপক চৌধুরী সহ আরও অনেকে এখনও আছেন সেই আবিস্কারের সাক্ষী। আমাদের “মিশন মাজনা” র গাইড অনুপম দাশ তখন ছোট ছিল। তারও ঝাপসা মনে আছে। অনুপম এবং তার দুই বন্ধুকে নিয়ে ঝোপঝাড় বিদীর্ণ করে, পাথর আঁকড়ে আমাদের নিয়ে গিয়ে ছিল মাজনার মায়াবী অণু-উপত্যকায়। নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না ক্যামেরাও সবটা ধরে রাখা যায় না মাজনার অতিপ্রাকৃতিক পরিবেশ যা বৈজ্ঞানিক মতবাদ পালন করে।

    মাজনার উপরিতল থেকে সুবর্ণরেখাটাকে চকচকে চওড়া তলোয়ারের মত দেখায়। সুবর্ণরেখার অববাহিকায় তামা ছিল। তাম্প্রপ্রস্তর যুগের এখানকার গুহাবাসী মানুষ লক্ষ্য করেছিল, পাথরের সঙ্গে রয়ে যাওয়া তামার টুকরা চুলার মধ্যে দিলেই আগুনের তাপে গলে যায় এবং নতুন রূপ নেয়। তামার এ গুণ পর্যবেক্ষণ করে তারা তামাকে প্রয়োজনানুযায়ী কাজে লাগাতে চেষ্টা করল। মাটিতে কিংবা অপেক্ষাকৃত নরম পাথরে গর্ত করে তারা ছাঁচ তৈরি করে এবং গলিত তরল তামা তার মধ্যে ঢেলে দিলে সেই তামা পরে ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ওই ছাঁচের মাপে জিনিস তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।
     এ প্রক্রিয়ায় প্রাচীন মানুষ কুড়াল, ছোরা, কাস্তে ও অন্যান্য বস্তু প্রস্তুত করেছিল। মাজনায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তামা গলানোর সেই উনুন। আবিস্কৃত হয়নি আরও অনেক কিছুই রয়ে গেছে নিশ্চিত। সব মিলিয়ে মাজুনায় যেন ঘুমিয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে জাগিয়ে তোলার জন্য অবিলম্বে সেই উদ্যোগ প্রয়োজন এটা বলাই বাহুল্য। বহু ক্রোস অতিক্রম করে আমরা যাদুঘরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে যাই। আর দেখুন একেবারে ঘরের পাশেই রয়েছে অমূল্যরতন। জীববৈচিত্র বৈচিত্র সংরক্ষণেও মাজনার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাণি আর উদ্ভীদ দুটিতেই বৈচিত্রের অভাব নেই। সব মিলেয়ে এই অণু-উপত্যকা যেন প্রকৃতির যাদুঘর।

    তথ্য সহায়তা এবং ফটোগ্রাফি – সৌরভ চক্রবর্ত্তী

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *