Sun. Mar 3rd, 2024
    WhatsApp Group Join Now
    Telegram Group Join Now

    বিষয় সূচি ~

      পরিচয়

    পেঁয়াজ প্রত্যেক দিন খেলে কি হয় জানুন।পেঁয়াজ প্রত্যেক দিন খেলে কি হয় জানুন। 15-health-benefits-of-onions

    অথর্ব বৈদিক উপবহন সংহিতায় ৭/১৭৫/১৭৬ সূত্রে রসুন ও পিঁয়াজকে এই শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার পরবর্তী যুগে অর্থাৎ মহর্ষি চরক ও সুশ্রুতাদির যুগে এই দুটি ফলকে পৃথক পৃথক রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক ঐতিহাসিক হােরােডেটাস প্রাচীন এক অনুশাসন থেকে উল্লেখ করেছেন যে মিশরের বৃহৎ পিরামিড তৈরির সময় প্রায় ৪,২৮,৮০০ পাউন্ড পিয়াজ ও রসুন ব্যবহৃত হয়েছিল কারিগরদের খাবার হিসাবে। কাজেই এ কথা অবশ্যই বলতে পারা যায় পিয়াজের ব্যবহার সবজি ও মশলা হিসাবে বহু যুগ আগে থাকতে চলে এসেছে। পুরানাে পুঁথিপত্রে পাওয়া যায় যে, মিশরেমােজে সময়ে পিয়াজের প্রচলন ছিল ।

    পিঁয়াজ এর বিভিন্ন নাম

    পাণ্ডুল, তীক্ষ্মকন্দ, উল্লী, মুখদুষণ, শূদ্রপিয়, দীপন, মুখ গন্ধক, বহুপত্র,বিশ্বগন্ধ, রােচক—এই এগারটি নাম রয়েছে। এছাড়াও ভাষা অনুসারে পিঁয়াজকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়ে থাকে। সংস্কৃত-মহাক, বাংলা-পিঁয়াজ, হিন্দি-পেঁয়াজ, মহারাষ্ট্র-শ্বেতকান্দা, কর্ণাটক-উলু,মুব্বাই-কন্দ,গুজরাট-দুঙ্গ লী, তেলেগু- নারুলি, তামিল-দুরল্পী,মালায়ালাম-উল্লী,অসমিয়া-পিঁয়াজ ইত্যাদি।

                পিঁয়াজের রাসায়নিক বিশ্লেষণ

    একটি বড় ধরনের পিয়াজ আমরা সাধারণতঃ পেয়ে থাকি

    পানি-                                     ৮৬.৮ শতাংশ।

    প্রােটিন-                                ১.২ শতাংশ।

    শর্করা জাতীয় পদার্থ –           ১১.৬ শতাংশ।

    ক্যালসিয়াম-                         ০.১৮ শতাংশ।

    ফসফরাস-                           ০.০৪ শতাংশ।

    লৌহ-                                    ০.৭ শতাংশ।

    ভিটামিন-                               এ, বি, সি।

    পরিচয় প্রসঙ্গ শেষ করবার আগে কয়েকটি কথা অবশ্যই বলা প্রয়ােজন। ফরাসি দেশে একে ‘পয়াজ’ বলা হয়। পণ্ডিতদের অনুমান,আমরা পয়াজ থেকে পিয়াঁজে রূপান্তরিত করে পিঁয়াজ নামে ডাকতে শুরু করেছি।

    বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জন্মায় এবং এটি একটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ। সাদা, ফিকে, গােলাপী ও লাল নানা রঙের পিয়াঁজ চাষ করা হয় । এটি রবি মরশুমের ফসল । পত্ৰদীর্ঘ সবুজবর্ণ। কন্দ থেকে সবুজ বর্ণের লম্বা পুষ্পদণ্ড বের হয়। ফসল তোলার প্রায় মাস খানেক আগে পটুম্পদণ্ডের আগায় গুচ্ছ আকারে সাদা ফুল হয় । পিয়াজের বােটানিক্যাল নাম হলাে “ অ্যালিয়াম সেপলিন” এটি লাইল্যাক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত উদ্ভিদ। বীজ থেকে চারা গাছ পাওয়া যায় আবার ছোট ছােট বন্দফুল।

    রােপন করেও চাষ করা চলে । আমাদের দেশে সাধারনতঃ তিন শ্রেণীর পিঁয়াজ দেখতে পাওয়া যায়। দেশী বড়, দেশী ছােট বা ছােট পিঁয়াজ এবং বড় আকারের মুম্বাই পিঁয়াজ ।

    পিয়াজের গুণ:-  গুণ সম্পর্কে প্রাচীন টেন্যে যে ঈঙ্গিত পাওয়া গেছে এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি বৈদিক গবেষণা থেকে নেওয়া হয়েছে। তােমার কন্দেই সুখ তাই তাই তুমি সুকন্দকে তুমি নমুচি ও শম্বরের প্রিয় ! তােমার অন্তর মদ্যের সার। যে ধনবান, সে শস্যবন, সে পিষ্টকবান, সে পুরােড়শ সম্পদ, তাকে তুমি বলদান কর। এর অন্তনিহিত ইঙ্গিত হচ্ছে পিষ্টকাদি গুরুপাচ্য ভােজ্যের সঙ্গে পালা বা রসােনের ব্যবহার ছিল। প্রাচীন এই তথ্য থেকে আমারা তিনটি ইঙ্গিত পাই।

    (১) তােমার কন্দে সুখ’ অর্থাৎ এই কন্দটি সমস্ত ইন্দ্রয়কে বলবান করে। ফলে দেহের সমস্ত শক্তিকে প্রাণবন্ত করে তােলে ।

    (২) তােমার অন্তর মদ্যের সার। অর্থাৎ মদ্যের সমস্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও মাদকতা দোষমুক্ত।

    (৩) যে পুরােডাশ সম্পন্ন, তাকে তুমি বলদান কর অর্থাৎ যজ্ঞকার্যের শীর্ষে যেমন দুগ্ধ, ঘৃত ও যব এই তিনটি দ্বারাও দেহের বল আসে ও ক্লান্তি দান করে। তােমার মধ্যেও এই তিনটি গুন বর্তমান ।

    চরকের হদিবর্ণ:- এই বর্ণের ওষুদগুলির বৈশিষ্ট্য হলাে যারা সূর্য কিরণের শক্তিকে গ্রহণ করে। সূর্য কিরণের আর এক নাম-হরিৎ। এটি দৈহিক শুক্র আর্যভাষ্যের কথা। এই কন্দমূলের প্রকৃতি বর্ণনায় বলা হয়েছে  এটি স্নেষ্মকারক, বায়ুনাশক, অল্প পিত্ত বর্ধক আহার্যের সহযােগি, বলকারক, বৃষ্য,রােচক ও জঠরানলের উদ্দীপক। একই কথা বলা হয়েছে সুশ্রুতের সমীক্ষায় ।

     পিঁয়াজের গুণ বিশ্লেষণ:- কটু মধু রস, মধুর পাক, উষ্ণবীর্য, তীক্ষ্ম,স্নিগ্ধ, গুরুপাক, রুচিকর, বলকারক, শুত্রবর্ধক, বাত, পিত্ত ও কফনাশক,বমন নিবারক এবং জ্বর নিবারক। শূল, সঞ্চিত, শ্লেষ্ম, কাশ, পাঁচড়া,চক্ষুরােগ ও কর্ণমূল রােগে উপকারক। তবে পিয়াজের বিশেষ গুন এটি শীতল, অগ্নিবর্ধক ও নিদ্রাকারক।

    বিভিন্ন রােগ নিরাময়ে পিয়াজের প্রচলিত ব্যবহার

    (১) অর্শে অতিরিক্ত রক্ত পড়লে:- খাওয়ার দোষে অথবা অন্য কোন কারণে অর্শে বেশি রক্ত পড়লে শরীর খুবই দূর্বল হয়ে পড়ে। তখন রীতিমত উদ্বেগের কারণ হয়। এই রকম পরিস্থিতিতে প্রতিদিন এক চামচ করে রসের সঙ্গে সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে দিনে ১ বার করে খাওয়ালে কয়েক দিনের মধ্যে রক্তপড়া বন্ধ হয়ে যায় ।

    (২) জ্বর আসার আগেঃ- জ্বর ঠিক হয়নি। অর্থাৎ জ্বর জ্বর ভাব । প্রস্রাব কমে গেছে। নাক প্রায় বন্ধ । নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কপালটা ধরে আছে। সব মিলিয়ে শরীরে একটা কষ্টকর ব্যাপার ঘটছে । এইরকম অবস্থায় পেঁয়াজের রস নাকে সরষের তেলের মতে টানলে বুকে জমা বা বসা সর্দি তাে বেরােবেই সেই সঙ্গে জ্বর জ্বর ভাবটাও চলে যাবে।

    (৩) নাক দিয়ে রক্ত পড়লে:- নাকে ঘা হলে সেটা অন্য কথা। তবে বহুক্ষেত্রে দেখা যায় পচণ্ড গরমে অথবা শীতে শরীর কষে গেলে হঠাৎ নাক ঝাড়লে চাপ-চাপ বা ডেলার আকারে রক্ত পড়ছে। এ ক্ষেত্রেও নাকে পিঁয়াজের রস টানলে রক্ত পড়া অবশ্যই বন্ধ হয়ে যাবে ।

    (৪) লুয়ের হাত থেকে রক্ষা:- দিল্লী, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও বিহারে গরমের সময় “লু” অর্থাৎ গরম হাওয়া বয় । প্রতি বছরেই লু লেগে বহু মানুষ মারা যায়। আমাদের পশ্চিববঙ্গেও দুর্গাপুর, রানীগঞ্জ ও আসানশেসাল অঞ্চলে ঐ সময় লু বয় । পিয়াজ রাখলে লু লাগতে পারে । অর্থাৎ পিয়াজের লু-কে প্রতিরােধ করার ক্ষমতা রয়েছে ।

    (৫) প্রস্রাবের বেগ ধারণের অক্ষমতা:- প্রস্রাব পেলে কিছু সময়ের জন্য চেপে রাখা সম্ভব হয় না। এমন কি দাঁড়ালেই প্রস্রাব হয়ে যাবে বলে মনে হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাব হয়ে গিয়ে জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরনের বে-সামাল অবস্থায় প্রতিদিন রাতে ভাত খাবার পর চা চামচের এক চামচ পরিমাণ পিঁয়াজের রস খেলে প্রস্রাবের অস্বস্তি চলে যাবে।

    (৬) সর্দির প্রথম মুখে:- সর্দিগর্মি অথবা হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে সর্দি হলে প্রথমদিকে নাক নিচু করলেই টপটপ করে নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে । এক চামচ পিয়াজের রসকে ২ চামচ ঠাণ্ডা পানিতে মিশিয়ে কিছু খাবার পর দিনে ১ বার করে খেলে উপকার হবেই তবে পরিমাণ যেন বেশি না হয়। এতে বমি হতে পারে ।

    (৭) পায়খানা পরিস্কার না হলে:- পায়খানা ঠিকভাবে না হলে শরীরে নানা রােগের সৃষ্টির হয়। কাজেই পেট পরিষ্কার হয়ে পায়খানা না হলে দেড় চামচ পিয়াজের রসে সম পরিমাণ সামান্য গরম পানি মিশিয়ে দিয়ে খেলে পেট পরিষ্কার হলে পায়খানা হয়ে যাবে ।

    (৮) বমি বন্ধ করতে:- বারবার বমি হচ্ছে,কিছুতেই বমি বন্ধ হচ্ছে না । চার থেকে পাঁচ ফোঁটা পিঁয়াজের রঙ্গ সামান্য ঠাণ্ডা পানিতে মিশিয়ে খাওয়ালে বমির বেগও কমে যাবে এবং বমি হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে ।

    (৯) হিক্কা বা হেঁচকি উঠলে:-  ৪ দারুণ হিক্কা উঠছে আতের কিছু নেই। এমন কি পানি খেয়েও হিক্কা বন্ধ হচ্ছে না। এক চামচ পিয়াজের রসে দ্বিগুণ পরিমাণ পানি মিশিয়ে সেই পানি একটু একটু করে খেলে হিক্কা ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে ।

    (১০) দুর্গন্ধ যুক্ত ঘায়ে:- শরীরের কোথাও ঘা হলে এবং তা থেকে পঁচে দুর্গন্ধ বার হতে থাকলে চার চামচ পিয়াজের রসে দ্বিগুণ পরিমাণে গরম পানি মিশিয়ে  ঘা দিনে দু’বার ধুলে পােকা হবে না । ঘায়ের দূর্গন্ধ দূর হবে। গবাদি পশুর শরীরে ঘা হলে এইভাবে পিয়াজ রসের পানি দিয়ে ঘা ধুতে পারা যায়।

    (১১) বিষ ফোড়ায়:- শরীরের কোথাও বিষ ফোড়া হলে এবং তার জন্য যন্ত্রণা হলে পিয়াজের রস সামান্য গরম করে বিষ ফোড়ায় লাগালে যন্ত্রণা কমে এবং একদিনে ফোড়া ভালাে হয়ে যায়।

    (১২) নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ:- দাঁতের বিভিন্ন ধরনের রােগে মুখ সেই সঙ্গে নিঃশ্বাসেও দুর্গন্ধ বার হতে থাকে। এই রকম ক্ষেত্রে দিনে দুবার কাঁচা পিয়াজ (খাবার দরকার নেই) চিবােলে মুখেও নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ দূর হয়ে যাবে। তবে লিভারের দোষে মুখে দুর্গন্ধ হলে এতে বিশেষ কাজ হবে না। তবে কাঁচা পিয়াজ চিবােলে দাঁতের গােড়া থেকে পুঁচ রক্ত পড়া, দাঁতে যন্ত্রণা কিছু খেলে দাঁত শিরিশির করা প্রভৃতি রােগ অবশ্যই ভালো হয়ে যাবে।

    (১৩) মেয়েদের স্তনে ফোড়া:- মেয়েদের পক্ষে খুবই কষ্টকর ব্যাপার। নরম জায়গা বলে বিশেষ কোন ওষুধ ব্যবহার করতে পারা যায় না । একমাত্র পিয়াজের রস গরম করে ফোড়ায় লাগালে খুবই উপকার পাওয়া যায়।

    (১৪) কানের বাইরে ঘা হলেও অনেক সময় দেখা যায় ছােট ছেলে মেয়েদের কানে ঘা হলে তা সহজে ভালাে হয় না। কিছুদিন পর ঐ ঘা থেকে পুঁচ এবং রক্ত বার হতে থাকে। এই ধরনের ঘা য়ে গরম পিয়াজের রস ১ থেকে ২ ফোটা দিন কতক দিলে ঘা সেরে যায়।

    (১৫) সর্দিতে মাথা ধরলে:- সর্দিতে মাথা ধরলে কপাল অথবা মাথার যে কোনাে একটি দিক মনে হয়ে খসে পড়ছে। কাঁচা পিয়াজের রস নাকে দিয়ে জোর করে টেনে নিলে মাথা ধরা কয়েক মিনিটের মধ্যে ভালাে হয়ে যাবে।

               পিয়াজ সম্পর্কে কিছু প্রয়ােজনীয় তথ্য।

    (১) পিঁয়াজ বেশি পরিমাণে ঘরে রাখলে সেই ঘরে পিয়াজের গন্ধে কোনদিনও সাপ আসে না ।

    (২) পিয়াজ কি এলার্জিকারক? না পিয়াজ এলার্জিকারক নয় । সাইনাস,টনসিল, পলিপাস ও বাতের রােগীদের পিয়াজ নিয়মিত খাওয়া দরকার ।

    (৩) পিয়াজ শরীরে দূষিত পদার্থবরে করে দেয়ঃ নিয়মিত পিয়াজ খেলে শরীরে ইউরিক এ্যাসিড ও ল্যাকটিক এ্যাসিড জমতে পারে না।

    (৪) প্রসবের পর প্রসূতির প্রস্রাবের যদি এ্যালবুমেন দেখা দেয় তবে কয়েকদিনে সকালের দিকে কিছু খাবার পর ৫ থেকে ১০ ফোটা পিয়াজের রস খেলে প্রস্রাবের অ্যালবুমেন দূর হয়।

    (৫) সাইনাস বা সাইরােভাইটিস রােগীদের ক্ষেত্রে পিয়াজ একটি ওষুধ বিশেষ ও পথ্য বলা চলে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *